পোড়াবাড়ীতেই অস্তিত্ব সংকটে চমচম
‘চমচম, টমটম ও শাড়ি’ এই তিনে টাঙ্গাইলের বাড়ি। টাঙ্গাইলের রাস্তাঘাট থেকে টমটম বিলুপ্তির পথে হলেও দেশ-বিদেশে ঐতিহ্যের সঙ্গে সুনাম ধরে রেখেছে টাঙ্গাইলের শাড়ি ও পোড়াবাড়ীর চমচম। তবে ব্যবসায়ী ও কারিগররা বলছেন, যোগাযোগ ব্যবস্থা, দেশি গাভির দুধের স্বল্পতাসহ নানা কারণে পোড়াবাড়ীতেই অস্তিত্ব সংকটে চমচম। জিআই স্বীকৃতি পাওয়া এই চমচমের নাম রাজধানীসহ সারা দেশের বিভিন্ন এলাকায় ব্যবহার করা হলেও তা আসল নয়।
পোড়াবাড়ীর চমচমের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো ইতিহাস। কেউ বলছে, দশরথ গৌড় নামে এক ব্যক্তি ব্রিটিশ আমলে আসাম থেকে টাঙ্গাইলের ধলেশ্বরী নদীর তীরবর্তী পোড়াবাড়ীতে আসেন। তিনি ধলেশ্বরীর পানি ও চরাঞ্চলের গরুর খাঁটি দুধ দিয়ে প্রথমে চমচম তৈরি শুরু করেন। পরে সেখানেই মিষ্টির ব্যবসা পাতেন। আবার কেউ কেউ বলছেন, ব্রিটিশ আমলে বাঙালি চন্দ্র গৌড় নামের এক ব্যক্তি পোড়াবাড়ীতে চমচমের উৎপাদন ও ব্যবসা শুরু করেন। বর্তমানে তার বংশধররা পোড়াবাড়ীতে চমচমের ব্যবসা টিকিয়ে রেখেছেন।
আরেক মত অনুযায়ী, ১৬০৮ সালে পোড়াবাড়ী গ্রামটিকে নদীবন্দর হিসাবে গড়ে তোলা হয়। সে সময় ধলেশ্বরীর পশ্চিম তীরে গড়ে উঠেছিল জমজমাট ব্যবসা কেন্দ্র-পোড়াবাড়ী বাজার। তখন পোড়াবাড়ী ঘাটে ভিড়ত বড় বড় সওদাগরি নৌকা, লঞ্চ ও স্টিমার। এ বাজারে যোগ হয় সুস্বাদু চমচম, গড়ে ওঠে মিষ্টির বাজার। ধীরে ধীরে পোড়াবাড়ীতে প্রায় অর্ধশত চমচম তৈরির কারখানা গড়ে ওঠে।
পোড়াবাড়ীর চমচমের আকার লম্বাটে। হালকা আঁচে পোড় খাওয়া বলে রং হয় গাঢ় বাদামি। দেখতে অনেকটা পোড়া ইটের মতো। বাইরে একটু শক্ত। তবে ভেতরের অংশ একেবারে নরম আর রসে টইটম্বুর। লালচে গোলাপি আভাযুক্ত ভেতরের নরম অংশের প্রতিটি কোষ কড়া মিষ্টি। ঘন রস আর টাটকা ছানার গন্ধমাখা এ মিষ্টির স্বাদ অতুলনীয়। সুস্বাদু চমচম তৈরির মূল উপাদান দুধ, চিনি, পানি, সামান্য ময়দা ও এলাচ দানা। শুধু নামেই নয়, আকৃতি আর স্বাদ-গন্ধেও এই মিষ্টি সেরা। তাই পোড়াবাড়ীর চমচমকে বলা হয় ‘মিষ্টির রাজা’।
বিয়ের অনুষ্ঠান, পূজা, জন্মদিন ও পরীক্ষায় ফল প্রকাশে এবং শ্বশুরবাড়ি বা আত্মীয় বাড়ি যাওয়ার সময় এই চমচমের জোড়া মেলা ভার। শহরের পাঁচআনি বাজারের প্রায় অর্ধশত মিষ্টির দোকানে প্রতিদিন তৈরি হয় পোড়াবাড়ীর চমচম। বেশির ভাগ দোকানের মালিক নিজেরাই চমচম তৈরি করেন।
৭৫ বছর বয়সি পোড়াবাড়ীর বাসিন্দা জয়দেব রাজবংশী বলেন, আমরা ছোট বেলায় দেখেছি পোড়াবাড়ী বাজারে ১০ পয়সায় ১ সের দুধ বিক্রি হতো। সেই দুধ থেকে উৎপাদিত চমচম সর্বোচ্চ ২ টাকা সের বিক্রি হতো। বর্তমানে ৮০ থেকে ১০০ টাকা কেজি দুধ আর চমচমের দাম ৩২০ থেকে ৩৫০ টাকা।
তিনি বলেন, আগে চমচমের যে স্বাদ ও সুঘ্রাণ ছিল, সেটা অনেকটাই কমে গেছে। আগে গরুকে দুর্বা ঘাস খাওয়ানো হতো। এখন ফিডসহ উৎপাদিত ঘাস খাওয়ানো হচ্ছে। উৎপাদিত ঘাসেও আবার বিভিন্ন কীটনাশক ব্যবহার করা হচ্ছে। যে কারণে আগের মতো খাঁটি দুধ পাওয়া যায় না। আগে ১ মন দুধ থেকে ৭ থেকে ৮ কেজি ছানা পাওয়া গেলেও এখন পাওয়া যাচ্ছে সর্বোচ্চ ছয় কেজি।
পোড়াবাড়ীর দীনেশ চন্দ্র গৌড় বলেন, এখানে আমার নানা বাঙালি চন্দ্র গৌড় চমচমের ব্যবসা শুরু করেছিলেন। আমি প্রায় ৫০ বছর ধরে চমচমের ব্যবসা করছি। আগে চমচম তৈরি করতে পাশের ধলেশ্বরী নদীর পানি ও গাভির খাঁটি দুধ ব্যবহার হতো। এখন নদীর পানি ব্যবহারযোগ্য নয়, তাই গভীর নলকূপের পানি ব্যবহার করছি। তিনি বলেন, আমি সিলেটে ঘুরতে গিয়ে দেখছি, সেখানে পোড়াবাড়ী চমচমের সাইনবোর্ড ব্যবহার করে মিষ্টি বিক্রি করা হচ্ছে। একই ভাবে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পোড়াবাড়ীর চমচমের সাইনবোর্ড ব্যবহার করা হলেও তা আসল নয়।
সুশীল সমাজের প্রতিনিধি টাঙ্গাইল ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক হারুন অর রশিদ বলেন, পোড়াবাড়ীর চমচম জেলার ইতিহাস-ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। জিআই স্বীকৃতি পাওয়া এ চমচমের মান ও স্বাদ ধরে রাখতে ব্যবসায়ীদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
টাঙ্গাইল চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক নাসির উদ্দিন বলেন, প্রতি মাসে জেলায় পোড়াবাড়ীর চমচমের শতকোটি টাকার বেশি বাণিজ্য হয়।






আপনার মতামত লিখুন
Array