প্রার্থী থেকে ভোটার সবার মনে আতংক

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: সোমবার, ২২ ডিসেম্বর, ২০২৫, ১১:২৭ পূর্বাহ্ণ
প্রার্থী থেকে ভোটার সবার মনে আতংক

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে নতুন এক বাংলাদেশে নতুনভাবে বাঁচার অঙ্গীকার নিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিল। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর গত বছরের ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। তারপর থেকেই আলোচনায় আসে গণতান্ত্রিক পদ্ধতির একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের। যার অঙ্গীকার করে ইউনূস সরকারও। এরই ধারাবাহিকতায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের লক্ষ্যে কাজ শুরু করে নির্বাচন কমিশনের পাশাপাশি সরকারও। আগামী মাসের ১২ ফেব্রুয়ারি যা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। কিন্তু এরই মধ্যে রাজনীতিতে এসেছে আবারও নতুন বাঁক।

ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদি আততায়ীর গুলিতে নিহতের ঘটনায় পুরো দেশ স্তব্ধ। প্রার্থীদের মধ্যে বিরাজ করছে আতংক। প্রচারে নেমে যখন দুর্বৃত্তদের হামলার শিকার হয়েছেন হাদি, তাই অন্যরাও কিছুটা শংকার মধ্যে রয়েছেন। শুধু তাই নয়, এ ঘটনায় আতংক বিরাজ করছে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে নির্বাচনে বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পেতে যাওয়া কর্মকর্তাদের মনেও। এমন পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও তৎপর হওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা। এদিকে সর্বকালের সেরা নির্বাচন উপহার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও ইসির নেই সে ধরনের প্রস্তুতি।

ফেনী-৩ আসনের বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী আব্দুল আওয়াল মিন্টু রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘এ বছরের শুরু থেকেই এলাকায় প্রচার চালাচ্ছি। বিশেষ করে তপশিল ঘোষণার পর এলাকা ছেড়ে ঢাকায় যাইনি। সব মিলিয়ে একটা উৎসবমুখর পরিবেশ ছিল। কিন্তু ওসমান হাদির মৃত্যুর ঘটনায় সবকিছুতে কেমন যেন একটা আতংক কাজ করছে। কোথাও নির্বাচনি প্রচার চালাতে গেলে মনে হয়- এই বুঝি পলাতক ফ্যাসিস্টের কেউ এসে হামলা চালাবে।’

এ প্রতিবেদন লেখার সময়েও তিনি গণসংযোগ চালাচ্ছেন জানিয়ে বলেন, ‘আমরা চাই একটি সুষ্ঠু ও গণতান্ত্রিক নির্বাচন। কিন্তু কোনো চোরাগুপ্তা হামলায় একটি প্রাণও যাক তা কেউ চাই না।’

একই কথা বলেন ঢাকা-১৭ আসনের বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) প্রার্থী আন্দালিব রহমান পার্থ। রূপালী বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘তপশিল ঘোষণার পর থেকেই আমার নির্বাচনি এলাকার অলিগলি চষে বেড়াচ্ছিলাম প্রচারের কাজে। আজও (গতকাল রোববার) প্রচার চালাচ্ছি। কিন্তু ওসমান হাদির মৃত্যুর পর সেই সাহসটা আর পাচ্ছি না। নিজের চারপাশে কে কীভাবে হামলা করার জন্য লুকিয়ে রয়েছে সেই আতংক বিরাজ করছে। এ জন্য প্রচার চলাকালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা আরও বেশি পরিমাণে চাই।’

শুধু প্রার্থীদের মধ্যেই নয়, আতংকে রয়েছেন নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করতে যাওয়া প্রিসাইডিং অফিসার, পোলিং এজেন্ট, রিটার্নিং কর্মকর্তারাও। যদিও এখনো কে কোন দায়িত্ব পাবেন তা জানা যায়নি। তবে যেহেতু সরকারি চাকরি করেন সেহেতু কোনো না কোনো দায়িত্ব পালন করতে হবে জানিয়ে সিলেটের একটি সরকারি মহিলা কলেজের সহযোগী অধ্যাপক (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘ঢাকার কি অবস্থা সিলেটে বসে বোঝা না গেলেও দেশে কিছু যে একটা হচ্ছে তা সহজে অনুমান করা যাচ্ছে। এর আগের বছরগুলোয় নির্বাচনি দায়িত্ব পালন করেছি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ রাঙানির পাশাপাশি স্থানীয় নেতাদের আধিপত্যের ভয়ে। তখন তো তাও শত্রু চেনা ছিল। কিন্তু এখন কে কোন দিক দিয়ে এসে ভয় দেখাবে বা হামলা করবে তা তো জানি না। পরিবার থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেÑ নির্বাচনি দায়িত্ব না নিতে। কিন্তু আমি না নিলে কি হবে, কেউ না কেউ তো দায়িত্ব পালন করবেই। তাদের নিরাপত্তা কে দেবে?’

যদিও নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেছেন, ‘দেশে খুব শিগগিরই যৌথ বাহিনীর অভিযান শুরু হবে।’

বন্ধুবেশে কেউ পাশে লুকিয়ে থেকে হামলা চালালে এক্ষেত্রে কার কি করণীয় থাকতে পারে উল্লেখ করে বিএনপি নেতা শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদির মৃত্যুকে ঘিরে দেশের রাজনীতিতে আবারও অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এতে আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটার আশংকা সবার মধ্যে। যদিও নির্বাচনের পরিবেশ ক্ষতি করে এমন বিষয়কে নিয়ন্ত্রণ করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তৎপর হওয়ার নির্দেশ দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। কিন্তু সাধারণ মানুষের মধ্যে ভীতি দূর করবে কে? ওসমান হাদির মৃত্যুর পর দুটি গণমাধ্যমে যে তাণ্ডব চালিয়েছে তারা কারা এখনো পুলিশ বের করতে পারেনি। তারা তো যেকোনো সময় যে কারো ওপর হামলা চালাতে পারে। এক্ষেত্রে নির্বাচনি প্রচার চালাব না নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করব।’

ভীতি কাজ করছে সাধারণ ভোটারদের মাঝেও। বিশেষ করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সংখ্যালঘুদের মধ্যে বিরাজ করছে মব আতংক। নাটোরের লালপুরের বাসিন্দা সোমনাথ দাস বলেন, ‘আমরা হিন্দু। এলাকার মানুষ হাজার বললেও বিশ্বাস করবে না আমরা নৌকার সাপোর্টার না। এমন অবস্থায় যদি ভোট দিতে গিয়ে মানুষজনের মারধরের শিকার হতে হয় তাহলে কে ঠেকাবে? তারচেয়ে জীবন বাঁচাতে ঘরে থাকাই ভালো।’ একই রকম আতংকিত সাতক্ষীরার সীমা সরকারও। তিনি বলেন, ‘একদল মানুষ মনে করে হিন্দু মানেই আওয়ামী লীগ, নৌকার সমর্থক। ভোট দিতে গেলে যদি কেউ পিটিয়ে মেরে ফেলে এর দায় কে নেবে? আবার ভোট দিতে না গেলেও তারা অবিশ্বাস করবে। আমাদের হয়েছে যত জ্বালা।’

চলতি মাসের ১১ তারিখ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দীনের রেকর্ডকৃত ভাষণ জাতির উদ্দেশে প্রচার করা হয়। এ সময় সিইসি জানান, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। একই দিন জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে গণভোটও হবে। ওই দিন সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত টানা ভোটগ্রহণ চলবে। ঘোষিত তপশিল অনুযায়ী, সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময় ২৯ ডিসেম্বর। মনোনয়নপত্র বাছাই ৩০ ডিসেম্বর থেকে ৪ জানুয়ারি। রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল দায়ের ১১ জানুয়ারি এবং আপিল নিষ্পত্তি হবে ১২ থেকে ১৮ জানুয়ারি। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময় ২০ জানুয়ারি। চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ ও প্রতীক বরাদ্দ করা হবে ২১ জানুয়ারি। নির্বাচনি প্রচার শুরু হবে ২২ জানুয়ারি, প্রচার শেষ হবে ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টায়। ১২ ফেব্রুয়ারি সারা দেশে ৩০০ সংসদীয় আসনে ভোটগ্রহণ করা হবে।

নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, এবারের নির্বাচনে মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৬ লাখের বেশি। প্রবাসী বাংলাদেশি ভোটাররাও পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। শুরুতে গত বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে জাতীয় নির্বাচন দেওয়ার দাবি জানিয়েছিল বিএনপিসহ কিছু দল। গত ৬ জুন জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেছিলেন, ২০২৬ সালের এপ্রিলের প্রথমার্ধে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এরপর ১৩ জুন যুক্তরাজ্যের লন্ডনে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠক করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ওই বৈঠকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে জাতীয় নির্বাচনের বিষয়ে দুজন একমত হন।

এরপর থেকে সরকার বারবার বলে আসছে, ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধেই জাতীয় নির্বাচন হবে। ইসিও সে লক্ষ্যে প্রস্তুতি এগিয়ে নেয়। এর মধ্যে গত ১৩ নভেম্বর প্রধান উপদেষ্টা ঘোষণা দেন, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে গণভোট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে একই দিনে অনুষ্ঠিত হবে। ইসিতে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোই কেবল দলীয় প্রতীকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও অংশ নিতে পারে। এখন ইসিতে নিবন্ধিত দল আছে ৫৬টি। এর মধ্যে রাজনৈতিক কর্মকা- নিষিদ্ধ থাকায় আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত আছে। নিবন্ধন স্থগিত থাকা দল নির্বাচনে অংশ নিতে পারে না। নিবন্ধিত অন্য দলগুলো এই নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবে। এর বাইরে প্রার্থী হওয়ার যোগ্য যেকোনো ব্যক্তি স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে পারেন।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গত বছরের ২১ নভেম্বর এ এম এম নাসির উদ্দীনের নেতৃত্বে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়। আগামী নির্বাচনই হবে এই কমিশনের অধীনে প্রথম কোনো নির্বাচন। এবার জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে হচ্ছে। দুটি ভোটের সময় ব্যবস্থাপনাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে ইসি। এর বাইরেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও ভাবিয়ে তুলছে জানিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘নির্বাচনের তপশিল ঘোষণার আগে ও পরে প্রার্থীদের ওপরে হামলা বিশেষ করে ওসমান হাদির ওপরে হামলা সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য অশনি সংকেত। এই হামলার ঘটনা প্রার্থী, কর্মী-সমর্থক ও ভোটারদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করছে। এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জের একজন প্রার্থী নিরাপত্তাহীনতার কথা বলে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। যদিও তিনি পরবর্তীতে আবার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। এই ঘটনাগুলো নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সবাইকে একটি ভয়ের পরিবেশের মুখোমুখি হওয়ার শঙ্কা জানান দিচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘তবে নির্বাচনি আচরণবিধি অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ ও আইনের দ্রুত এবং কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে পারলে নির্বাচনি সংঘাত-সহিংতা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। একটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন। ভোটের চেয়ে জীবনের মূল্য অনেক বেশি। নিরাপত্তার ক্ষেত্রে জোরালো ব্যবস্থার ঘাটতি থাকলে ভোটারদের আগ্রহ ও অংশগ্রহণও কমে যেতে পারে। একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও স্থিতিশীল থাকার সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে। এর কোনো বিকল্প নেই। যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করেই দৃশ্যমান ঘাটতি পূরণ করতে হবে এবং জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে।’

এদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের ইতিহাসে এমন পরিস্থিতিতে জাতীয় নির্বাচন আর কখনো অনুষ্ঠিত হয়নি। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময় থেকে দেশের ইতিহাসে গণঅভ্যুত্থানে কোনো সরকারের পদত্যাগের নজির না থাকায় আসন্ন নির্বাচন নিয়ে উৎসুক পুরো দেশের মানুষ। রাজধানী থেকে তৃণমূল সর্বত্র বিরাজ করছে ভোটের আবহ। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আনতে পারলে সব প্রচেষ্টা বৃথা যাবে বলে মত তাদের।

সংবাদটি rupalibangladesh.comওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে। তথ্যের সঠিকতা ও মালিকানা বিষয়ে কোনো প্রশ্ন থাকলে অনুগ্রহ করে মূল সূত্রের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।