মশা মারতে দুই সিটির কামানে ‘নতুন গোলা’
মশা মারতে ফের নতুন কীটনাশক আনার পরিকল্পনা করছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। এরই মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) নতুন কীটনাশক আনার ব্যাপারে ফাইলপত্র চালাচালি শুরু করেছে। অন্যদিকে, উত্তর সিটি কম্বিনেশন অব থ্রি (কীটনাশকের নাম নয়, তিনটি রাসায়নিকের সমষ্টি) এবং আবারও বিটিআই কীটনাশক আনার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে নতুন কীটনাশক কবে আমদানি হবে, এখনই সুনির্দিষ্ট করে জানাতে পারেনি সংস্থাটি।
জুন মাস পার হলেই নগরবাসীর মনে জুজুর মতো চেপে বসে ডেঙ্গুর আতঙ্ক। এবারও সেই আতঙ্কে দিন পার করছে রাজধানীবাসী। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বছরের ২৪ জুলাই পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয় ১২ হাজার ২০১ এবং একই সময়ে ডেঙ্গুতে মৃত্যু ৩৯ জনের। ক্রমাগত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত এবং মৃত্যুর তথ্য ভাবিয়ে তুলেছে ঢাকার দুই সিটিকেও। কিছুদিন ধরেই সংস্থা দুটি নতুন কীটনাশক আনার ব্যাপারে নীরবে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। যার ফল হয়তো চলতি বছরের সেপ্টেম্বর নাগাদ দৃশ্যমান হবে নগরবাসীর কাছে। এবার দুই সিটি তিনটি নতুন কীটনাশক প্রয়োগ করবে মশা নিয়ন্ত্রণে।
বর্তমানে ডিএসসিসি মশা নিধনে দুটি কীটনাশক ব্যবহার করে। লার্ভিসাইডিংয়ে বা মশার লার্ভা নিধনে টেমিফস এবং পূর্ণাঙ্গ মশা নিধন বা অ্যাডাল্টিসাইডিংয়ের জন্য সংস্থাটি ব্যবহার করে ম্যালাথিয়ন ৫ শতাংশ। এ ছাড়া জমা পানিতে লার্ভিসাইডিংয়ের জন্যও টেমিফস ব্যবহার করে দক্ষিণ ঢাকা। নতুন করে শিগগিরই জমা পানির লার্ভা নিধনে ডিএসসিসি প্রয়োগ করতে যাচ্ছে নোভালিউরন ট্যাবলেট।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি জানিয়েছে, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে নোভালিউরন ট্যাবলেট আনার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সে কারণেই নতুন করে এই কীটনাশক আনার উদ্যোগ নিয়েছে সংস্থাটি। এরই মধ্যে নোভালিউরন ট্যাবলেট আনার জন্য ফাইল প্রক্রিয়াধীন— জানালেন এক কর্মকর্তা। যদিও দক্ষিণ সিটির কর্মকর্তারা মনে করেন, জমা পানিতে বা পানির মিটারহোলের লার্ভা নিধনে টেমিফসই ভালো কাজ করে। তবে এসব জায়গায় দেওয়ার জন্য মন্ত্রণালয় থেকে নোভালিউরন ট্যাবলেট কিনতে বলায় ভবিষ্যতে মিটারহোল এবং নির্মাণাধীন ভবনের যেসব জায়গায় পানি জমে থাকে বা জমিয়ে রাখা হয়, সে ধরনের অল্পকিছু জায়গায় এই ট্যাবলেট প্রয়োগের কথা জানিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ।
এ বিষয়ে ডিএসসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহানে ফেরদৌস বিনতে রহমান আগামীর সময়কে বলেছেন, নোভালিউরন ট্যাবলেট ব্যবহার করতে মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছে। ফলে সেটি ব্যবহার করা হবে। তবে কবে নাগাদ এবং প্রাথমিকভাবে কী পরিমাণ ট্যাবলেট প্রয়োগ করা হবে, সেসব নিয়ে কোনো তথ্য দেননি এই কর্মকর্তা। অন্যদিকে, বর্তমানে উত্তর সিটি করপোরেশন লার্ভিসাইডিংয়ের জন্য টেমিফস কীটনাশক ব্যবহার করে। তবে জমা পানির লার্ভা মারার জন্য দীর্ঘদিন ধরেই নোভালিউরন ট্যাবলেট ব্যবহার করে আসছে ডিএনসিসি। অ্যাডাল্টিসাইডিংয়ের জন্য সংস্থাটি ব্যবহার করে ম্যালাথিয়ন ৫ শতাংশ। এবার এই তিন কীটনাশকের পাশাপাশি আরও নতুন দুটি কীটনাশক প্রয়োগ করবে উত্তর সিটি। যার একটি বাসিলাস থুরিনজেনসিস ইসরায়েলেনসিস (বিটিআই), যা জমা পানির লার্ভা ধ্বংস করবে। অন্যটি কম্বিনেশন অব থ্রি। এটি মূলত কোনো একক কীটনাশকের নাম নয়, তিনটি রাসায়নিকের একটি সংমিশ্রণ। যার মধ্যে রয়েছে ডাইমেফ্লুথ্রিন শূন্য দশমিক তিন শতাংশ, মেপারফ্লুথ্রিন শূন্য দশমিক দুই শতাংশ এবং এসবায়োথ্রিন শূন্য দশমিক এক শতাংশ। সংস্থাটির দাবি, এই তিন কীটনাশকের তিন ধরনের বৈশিষ্ট্য পূর্ণাঙ্গ মশাকে সম্পূর্ণ মেরে ফেলতে সক্ষম।
ডিএনসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী আগামীর সময়কে বলছিলেন, কম্বিনেশন অব থ্রির মধ্যে থাকা তিনটি রাসায়নিকের একটি মশাকে মাটিতে ফেলে দেবে, আরেকটি মশাকে প্যারালাইজড বা অথর্ব করবে এবং তৃতীয় উপাদানটি মশাকে মেরে ফেলবে। এর পাশাপাশি ম্যালাথিয়নের ব্যবহার চলবে বলেও জানালেন তিনি। এডিসের পিক টাইমে— অর্থাৎ সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে পাইলটিং প্রকল্প হিসেবে কিছু এলাকায় কম্বিনেশন অব থ্রি প্রয়োগ করা হবে এবং পরে ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে নতুন করে প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নেবে ডিএনসিসি। প্রথমদিকে, দুটি ভাগে সপ্তাহকে ভাগ করে পর্যায়ক্রমে ম্যালাথিয়ন এবং কম্বিনেশন অব থ্রি ব্যবহার করা হবে। একটি নির্দিষ্ট সময় পর বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ মেনে ম্যালাথিয়ন বন্ধ করে শুধু কম্বিনেশন অব থ্রি ব্যবহার করবে ডিএনসিসি।
উত্তর সিটির তালিকায় থাকা অন্য কীটনাশক বিটিআইয়ের ব্যবহার আগেও করেছে সংস্থাটি। ২০২৩ সালের আগস্টে প্রথমবারের মতো মশা নিধনের জন্য বিটিআই কীটনাশক প্রয়োগ করে ডিএনসিসি। তবে এই কীটনাশক আমদানিতে জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়ায় ওই মাসের শেষের দিকে কার্যক্রমটি সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়। এবার আবার নতুন করে বিটিআই আনছে উত্তর সিটি। মূলত বিটিআই হলো একটি পরিবেশবান্ধব প্রাকৃতিক ব্যাকটেরিয়া, যা মশার লার্ভা মেরে ফেলে, তবে প্রাপ্তবয়স্ক মশা মারতে পারে না। শুধু জমে থাকা পানিতে লার্ভিসাইড হিসেবে ছিটিয়ে মশার বংশবৃদ্ধি কার্যকরভাবে রোধ করা যায়। এটি মানুষ, পোষা প্রাণী বা জলজ জীবের কোনো ক্ষতি করে না। ড্রেন, ফুলের টব, টায়ার বা নির্মাণাধীন ভবনের জমে থাকা পানি যেখানে মশার লার্ভা জন্মাতে পারে, সেখানে বিটিআই প্রয়োগ করা হয়। যখন মশার লার্ভা এই বিটিআই গ্রহণ করে, তখন ব্যাকটেরিয়াটি তাদের অন্ত্রে বিষাক্ত ক্রিস্টাল তৈরি করে। এতে লার্ভাগুলো মারা যায়। এরই মধ্যে বিটিআই নিয়ে প্রাথমিক পরীক্ষাও চালিয়েছে ডিএনসিসি। গুলশান লেকে ২০২৫ সালের মার্চ মাস এই পরীক্ষা চালায় উত্তর সিটি। তবে নতুন করে এবার কবে নাগাদ বিটিআই আমদানি করা হবে, এর কোনো সময় জানায়নি সংস্থাটি।
দুই সিটির নতুন কীটনাশক প্রয়োগের চিন্তাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। ডা. বে-নজির আহমেদ আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘এডিসের ধরন ভিন্ন। ফলে শুধু মশক নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি দিয়ে এডিস কমানো সম্ভব নয়; বরং দুই ধরনের মশার কথা চিন্তা করতে হবে। যার একটি এডিস এবং অন্যটি কিউলেক্সসহ অন্যান্য মশা। এ দুই ধরনের মশার জন্য সমন্বিত বালাইনাশক কার্যক্রম দরকার।’
নতুন কীটনাশক নিয়ে দ্বিমত নেই এই বিশেষজ্ঞের। তিনি মনে করেন, অ্যান্টিবায়োটিকের মতো একসময় পুরনো কীটনাশকেরও সহনশীলতা তৈরি হয়ে যায়। ফলে নতুন কীটনাশক দরকার হতেই পারে। কিন্তু শুধু কীটনাশক পরিবর্তন নয়; বরং সমন্বিত কাজকে গুরুত্ব দিতে বলেছেন এই জনস্বাস্থ্যবিদ। এ ছাড়া ড্রেন পরিষ্কার ও এর পানির প্রবাহ সচল রাখার এবং পূর্ণাঙ্গ মশার চেয়ে লার্ভা ও মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে বেশি মনোযোগ দেওয়ারও পরামর্শ দিলেন তিনি।







আপনার মতামত লিখুন
Array