টাঙ্গাইলে শীতজনিত রোগের প্রকোপ, রোগীর চাপে দিশেহারা হাসপাতাল
টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়া সহ শীতজনিত রোগীর চাপে চিকিৎসক ও নার্সরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। জেনারেল হাসপাতালে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগী আসনের তুলনায় ১০ গুণ ভর্তি রয়েছে। ফলে তাদেরকে বাইরে গাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে স্যালাইন দেওয়া হচ্ছে। হাসপাতালে ওষুধ সংকটও চরম আকার ধারণ করেছে।
এদিকে, মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ওয়ার্ড না থাকায় ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের জেনারেল হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। রোগীদের অধিকাংশই শিশু ও প্রবীণ।
টাঙ্গাইল ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতালে ডায়রিয়া ওয়ার্ডে আসন রয়েছে ১৩টি। সেখানে রোগী ভর্তি রয়েছে ১২৫ জন। এর মধ্যে সোমবার দুপুর পর্যন্ত ১৬ জন এবং রোববার ভর্তি হয়েছেন ১০৯ জন।
এই হাসপাতালে নিউমোনিয়া ওয়ার্ডে সাধারণ ১০টি এবং পেইং ১০টি সহ মোট ২০টি আসন রয়েছে। হাসপাতালে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত ৫৭ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন। এর মধ্যে সোমবার দুপুর পর্যন্ত ১৬ জন এবং রোববারের ভর্তি রোগী রয়েছেন ৪১ জন।
টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, এখানে ডায়রিয়া আক্রান্তদের জন্য কোনো ওয়ার্ড নেই। ঠান্ডাজনিত রোগীদের মধ্যে যারা ডায়রিয়ায় আক্রান্ত তাদেরকেই চিকিৎসা দেওয়া হয়। সরাসরি ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের তারা পাশের জেনারেল হাসপাতালে পাঠিয়ে দেন। এই হাসপাতালে নিউমোনিয়া ওয়ার্ডের ৪২টি আসনের বিপরীতে নিউমোনিয়া আক্রান্ত হয়ে ৬৬ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে সোমবার দুপুর পর্যন্ত ৩৪ জন এবং রোববারের ভর্তি রোগী রয়েছেন ৩২ জন।
সরেজমিনে দেখা যায়, শীতজনিত রোগীর চাপে হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্সরা দম ফেলার ফুসরত পাচ্ছেন না। জেনারেল হাসপাতালের ডায়রিয়া ওয়ার্ডের বিছানা, ফ্লোর ও বারান্দায় রোগীতে ভরপুর। ডায়রিয়া ওয়ার্ডের আঙিনায় ছোট ছোট গাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে রোগীদের স্যালাইন দেওয়া হচ্ছে। তারা অনেক সময়ই হাসপাতাল থেকে ওষুধ পাচ্ছেন না।
স্বজনরা অভিযোগ করেন, বাইরে থেকে ওষুধ কিনে চিকিৎসা করাতে হচ্ছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ স্যালাইন ও ২-৪টি ট্যাবলেট ছাড়া জরুরি ওষুধগুলো সরবরাহ করছে না। বাধ্য হয়ে স্বজনরা বাইরে থেকে অধিক দামে ওষুধ কিনছেন।
কালিহাতী থেকে আসা এক রোগীর স্বজন রকিবুল হাসান জানান, শিশুর ডায়রিয়া হওয়ায় তিনি রোববার দুপুরে টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখান থেকে তাকে জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়। জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হলে তাকে কোনো আসন বা বিছানা দেওয়া হয়নি। বাড়ি থেকে মাদুর এনে হাসপাতালের আঙিনায় বিছানা পেতে রয়েছেন। সেখানে গাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে তার রোগীকে স্যালাইন দেওয়া হচ্ছে। বাকি ওষুধগুলো তিনি বাইরের দোকান থেকে অতিরিক্ত দাম দিয়ে কিনেছেন।
দেলদুয়ারের আমিনুল, বাসাইলের নজমুল ইসলাম ও সদর উপজেলার আকরাম আলী সহ বিভিন্ন রোগীর স্বজনরা জানান, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ শুধুমাত্র স্যালাইন ও ২-৪টি ট্যাবলেট দিয়ে থাকে। বাকি সব ওষুধ বাইরের দোকান থেকে কিনতে হয়। মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বিনামূল্যে ভালো চিকিৎসা হয় জেনে তারা এসেছিলেন। কিন্তু সেখানে ডায়রিয়ার কোনো রোগীই ভর্তি না করে জেনারেল হাসপাতালে পাঠিয়ে দিয়েছে। জেনারেল হাসপাতালে রোগীর চাপ বেশি, চরম ওষুধ সংকট ও অব্যবস্থাপনায় তাদের নাভিশ্বাস উঠে গেছে।
টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর শহিদুল ও রাজিব বর্মণ নামে দুই স্বজন অভিযোগ করেন, কর্তৃপক্ষ ২-১টি ওষুধ ব্যতীত সবই সরবরাহ করছে। কিন্তু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাবে হাসপাতালের পরিবেশ নোংরা ও আবর্জনায় ভরে থাকে। স্যালাইন, ন্যাকিন, সুঁচ সহ সিরিঞ্জ, গজ-ব্যান্ডেজ হাসপাতালের পরিত্যক্ত স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। হাসপাতালে ঢুকলেই উৎকট গন্ধে অবস্থান করা দুরূহ হয়ে পড়ে।
টাঙ্গাইল ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. খন্দকার সাদিকুর রহমান জানান, স্থান সংকুলান না হওয়ায় তারা বাইরে রোগী রাখতে বাধ্য হয়েছেন। যেসব রোগী বাইরে রয়েছে আগামীকাল মঙ্গলবার থেকে তাদেরকে হাসপাতালের ৭ নম্বর ওয়ার্ডে স্থানান্তর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রয়োজন হলে ৬ নম্বর ওয়ার্ডেও নেওয়া যাবে। ওষুধের ঘাটতি পূরণের জন্য কিছু আনা হয়েছে এবং আরও ওষুধের চাহিদা পাঠানো হয়েছে, যা আগামীকাল আসবে। তাহলে আর ওষুধের ঘাটতি থাকবে না।
তিনি জানান, হাসপাতালে ১৭৮টি পদের বিপরীতে চিকিৎসক রয়েছে ৪৪ জন। ওই স্বল্পসংখ্যক চিকিৎসক দিয়ে বাড়তি রোগীর চাপ সামলানো কষ্টকর। তারপরও রোগীর সেবা দিতে চিকিৎসক ও নার্সরা দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন।
টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজের পরিচালক ডা. আব্দুল কুদ্দুছ জানান, তাদের ওখানে ডায়রিয়া ওয়ার্ড না থাকায় রোগী এলে তাদেরকে পাশের জেনারেল হাসপাতালে পাঠিয়ে দেন। নিউমোনিয়া ওয়ার্ডে ৪২টি বিছানার বিপরীতে ৬৬ জন রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। এই সময়ে শীতজনিত রোগীর সংখ্যা বেশি। তাদেরকে যথাযথ চিকিৎসা সেবা দেওয়া হচ্ছে। প্রায় ৫০০ শয্যার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসক সংকট নিত্যনৈমিত্তিক বিষয় হওয়ায় এই বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করবেন না। তাদের হাসপাতালে ওষুধের কোনো ঘাটতি নেই। স্টোরে পর্যাপ্ত পরিমাণ ওষুধ রয়েছে এবং রোগীদের চাহিদা অনুযায়ী তা সরবরাহ করা হয়ে থাকে।
ইএইচ






আপনার মতামত লিখুন
Array