১৪ দিনের তদন্ত শেষ হয়নি দুই মাসেও

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: বুধবার, ২৯ এপ্রিল, ২০২৬, ১১:০২ পূর্বাহ্ণ
১৪ দিনের তদন্ত শেষ হয়নি দুই মাসেও

সরকারি পরিপত্র অনুসারে, তদন্ত কমিটি ১৪ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করবে। কিন্তু সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (সিকৃবি) সিনিয়র অধ্যাপক ড. নাসরীন সুলতানা লাকীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত দুই মাসেও শুরু হয়নি। এই সময়ের মধ্যে কোনো বৈঠকেও বসতে পারেননি কমিটির সদস্যরা।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের একটি সূত্র, অভিযুক্ত অধ্যাপক এবং তদন্ত কমিটির কয়েকজন সদস্য জানান, কমিটির আহ্বায়ক সভা আহ্বান না করায় তারা বৈঠকে বসার সুযোগ পাননি। এদিকে কমিটির আহ্বায়ক ড. মো. মনোয়ার করিম খান বলছেন ভিন্ন কথা। তার বক্তব্য, সব সদস্যের সময় না হওয়ায় যথাসময়ে বৈঠক বা তদন্ত সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। অবশ্য সিকৃবির ভিসি অধ্যাপক ড. আলিমুল ইসলাম আগামী ১০-১২ দিনের মধ্যে কমিটি তদন্ত সম্পন্ন করবে বলে জানিয়েছেন। ‘ভিসির কারণে কমিটি তদন্তে সময় নিচ্ছে’Ñ একটি মহল থেকে এমন দাবি উঠলেও তিনি সেই দাবি অস্বীকার করেন।

অধ্যাপক ড. নাসরীন সুলতানা লাকী তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এবং তদন্ত কমিটি গঠন হয়রানিমূলক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেন। তিনি জানান, এখনো তদন্ত শুরু হয়নি এবং কমিটি তাকে ডাকেনি। তিনি বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সত্য নয়। আমি শুরু থেকে বলে আসছি, এই কমিটি একটি বাহানা মাত্র। আমাকে হয়রানি করার জন্য করা। বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন অনিয়ম-অন্যায় ও শিক্ষার্থীদের স্বার্থবিরুদ্ধ কাজের প্রতিবাদ করার কারণে ভিসি সংক্ষুব্ধ হয়ে আমাকে শায়েস্তা এবং বিব্রত করতে এসব করছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের পর থেকে অনিয়মের নানা তথ্য গণমাধ্যমে প্রচারিত হওয়ার পরই মূলত তিনি আমাকে প্রতিপক্ষ বানান। তার ধারণা, আমি গণমাধ্যমকে প্রভাবিত করছি! যা সঠিক নয় এবং অসম্ভবও।’

বিদ্যুৎ উৎপাদনে নতুন দিগন্ত
বিদ্যুৎ উৎপাদনে নতুন দিগন্ত
বিস্তারিত পড়ুন
বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্র জানায়, সিকৃবির ভিসি অধ্যাপক ড. আলিমুল ইসলামের সঙ্গে তার বিভাগ এবং বিভাগের বাইরের একাধিক ইস্যুতে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়াই কাল হয়েছে অধ্যাপক ড. নাসরীন সুলতানা লাকীর। এরপর থেকে ড. নাসরীনকে মুখোমুখি হতে হয় তদন্ত এবং প্রশাসনিক নানা জটিলতার। অনেকটা গোপনে এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ডাকা ৫০তম সিন্ডিকেট সভার মাধ্যমে জ্যেষ্ঠ এই অধ্যাপককে উচ্চতর তদন্তের নামে সাময়িক বহিষ্কারাদেশ দেওয়া হয়। ড. নাসরীনের দাবি, সব অভিযোগই আরোপিত। সিন্ডিকেট সভার সিদ্ধান্তের পর থেকে আটকে আছে তার বেতন-ভাতা। এমনকি অংশ নিতে পারছেন না পাঠদানে। অ্যাকাডেমিক পরীক্ষাও নিতে পারছেন না। সবকিছু থেকে তাকে দূরে রাখা হচ্ছে।

সূত্র জানায়, ড. নাসরীনের বিরুদ্ধে প্রথম তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় ২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর। তবে ওই কমিটি গঠনের পর ‘বিষয়বহির্ভূত ও নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে জুনিয়র ও অভিযুক্ত ব্যক্তি দিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে’ দাবি করে অভিযোগ দায়ের করেন অধ্যাপক নাসরীন। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বরে ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্জারি ও থেরিওজেনোলজি বিভাগের শিক্ষা সমস্যা নিরসন’ বিষয়ে আরেকটি কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটি ড. নাসরীনকে অভিযুক্ত করে। এটি নিয়েও আপত্তি উঠলে তদন্ত আর এগোয়নি।

পরে সিন্ডিকেট বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় ২০২৫ সালের ১০ ডিসেম্বর। এই কমিটি নিয়েও আপত্তি উঠলে চলতি বছরের ২ মার্চ সেই কমিটি পুনর্গঠন করা হয়। তারপর প্রায় দুই মাস হতে চলেছে, কিন্তু এর কার্যক্রমই শুরু হয়নি।

এই কমিটির আহ্বায়ক কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশনের (কেজেএফ) সিনিয়র স্পেশালিস্ট (জলবায়ু ও প্রাকৃতিক সম্পদ) ড. মো. মনোয়ার করিম খান। এতদিনেও তদন্ত শুরু না করা বা কমিটির কোনো বৈঠক ডাকতে না পারা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমি ডাকছি না, এটা সঠিক নয়। কমিটির বাকি সদস্যরা সময় দিতে পারছেন না বলেই সভায় বসা সম্ভব হয়নি। ঢাকা থেকে সদস্যরা সিলেটে গিয়ে তদন্ত করবেন, সে জন্য সবার সময় একই সঙ্গে হওয়া দরকার, কিন্তু সেটি হচ্ছে না, তাই আমি চাইলেও সভায় বসা যাচ্ছে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা যত দ্রুত সম্ভব বসে তদন্ত শেষ করব।’

এদিকে ঢাকায় থাকা কমিটির সদস্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. কাজী মারুফুল ইসলাম কমিটির আহ্বায়ক ড. মো. আনোয়ার করিম খানের ‘ঢাকার সদস্যরা সময় দিচ্ছেন না’ অভিযোগ সঠিক নয় বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, ‘আমাকে আজ পর্যন্ত কমিটি থেকে কোনো ফোন বা যোগাযোগ করা হয়নি। এমনকি বৈঠকের সময় চাওয়া বা দেওয়াও হয়নি। আমার জন্য তদন্ত যথাসময়ে হয়নি বা হচ্ছে নাÑ এ কথা সঠিক নয়।’ কমিটির আরেক সদস্য সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. দিলারা রহমানও আহ্বায়ক ড. আনোয়ার করিম খানের অভিযোগ অস্বীকার করেন।

সূত্র জানায়, সিকৃবির ৫০তম সিন্ডিকেট বৈঠকের কার্যবিবরণী অনুসারে সাপ্লিমেন্টারি ‘ঙ’ নম্বরে আলোচ্যসূচিতে মাত্র একটি বিষয়। তাও বিতর্কিত। কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে একাধিক। এ নিয়ে সিন্ডিকেটের সদস্যরা তীব্র আপত্তি জানান। এমনকি তারা ভিসির গঠিত তদন্ত কমিটিও মানেননি। পরে সিন্ডিকেট সদস্যদের সুপারিশে আরও দুজন সদস্য যোগ হলেও অফিসিয়াল পত্রে দেখা যায় বিষয়বস্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন।

রূপালী বাংলাদেশের কাছে ড. নাসরীন দাবি করেন, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মচারী শৃঙ্খলাবিধি আইন না থাকলেও আমার বেলায় সেই আইন প্রয়োগ করা হয়েছে। এদিকে আইন নেই বলে সিন্ডিকেটে সিদ্ধান্ত হয়Ñ আইন না হওয়া পর্যন্ত কাউকে কোনো প্রকার শাস্তি প্রদান করা যাবে না। এই আদেশবলে আরেক ঘটনায় জামায়াত ঘরানার কর্মকর্তা আতিকুল ইসলাম অভিযুক্ত হলেও তার বেতন-ভাতার কোনো অংশই কর্তন করা হচ্ছে না। কিন্তু জাতীয়তাবাদী দলের শিক্ষকের ক্ষেত্রে বৈষম্য করা হচ্ছে। এখানে দ্বিচারিতার অভিযোগ আনেন ড. নাসরীন।

এ বিষয়ে কথা বলতে চাইলে একাধিক শিক্ষক ক্ষোভ প্রকাশ করেন। কিন্তু তারা ‘চাকরি হারানো’র ভয়ে গণমাধ্যমে বা জনসম্মুখে আসছেন না, মুখ খুলছেন না।

ড. নাসরীন সুলতানা লাকী বলেন, শুধু আমি নই, জুনিয়র শিক্ষক ডা. মাহফুজও রোষানলের শিকার। এর কলকাঠি নাড়ছেন তার বিভাগেরই শিক্ষক অধ্যাপক অনিমেষ। তিনি ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ দলীয় শিক্ষক নেতা।

এসব বিষয়ে সিকৃবি ভিসি অধ্যাপক ড. আলিমুল ইসলাম বলেন, অধ্যাপক ড. নাসরীন সুলতানা লাকীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তার বিভাগ থেকেই এসেছে। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থবিরোধী কাজে জড়িত। এ প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষুণœ করছেনÑ এমন অভিযোগের সত্যতার তথ্য-প্রমাণ পেয়েছি বলেই আমরা তার বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি করেছি। একাধিক কমিটি হয়েছে তার বিরুদ্ধে। এরই মধ্যে একটি কমিটি প্রতিবেদন জমাও দিয়েছে, যেখানে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ড. আনোয়ার করিম খানের কমিটি কাজ করছে। সময়মতো তারা তদন্ত শেষ করতে পারেননি, এটা ঠিক। আমরা তাদের তাগাদা দিয়েছি শেষ করার। দুয়েক সপ্তাহের মধ্যে তদন্ত শেষ করা সম্ভব হবে বলে জানানো হয়েছে। কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী তার ব্যাপারে স্থায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তিনি দোষী সাব্যস্ত না হলে সবকিছু ফিরে পাবেন। আর দোষী হলে সুপারিশ অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে প্রশাসন।