দাম বাড়ে আয় বাড়ে না

‘আমাগো মতো অল্প আয়ের মানুষের মাসের খরচ মেটানোই ম্যালা কষ্ট’

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল, ২০২৬, ১২:০৮ অপরাহ্ণ
‘আমাগো মতো অল্প আয়ের মানুষের মাসের খরচ মেটানোই ম্যালা কষ্ট’

সম্প্রতি দেশে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় বাস, পরিবহনের ভাড়াসহ বেড়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় সকল পণ্যের দাম। কিন্তু সেই অনুপাতে বাড়ছে না মানুষের আয়। বিশেষ করে গ্রামের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনযাত্রার আয় ও ব্যয়ের মধ্যে তৈরি হচ্ছে বড় ধরনের ব্যবধান। ফলে স্থানীয় বাজারদর, কৃষকের উৎপাদনের খরচ ও দিনমজুরের মজুরির তথ্য বিশ্লেষণে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে জীবনযাত্রার এই বাস্তব চিত্র।

মানিকগঞ্জ ঘিওর উপজেলার ঘিওর বাজারে ৮ বছর ধরে কামারের কাজ করেন সঞ্চয় রাজবংশী (২৪)। আগামীর সময়কে তিনি বলছিলেন, ‘দিনে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা রোজগার করি। কোনো দিন এর থেকে বেশিও হয়। সেই অনুযায়ী মাসে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা আয় হয়। কিন্তু যে টাকা আয় করি, তা-ই সংসারের খরচ হয়ে যায়। একটি নতুন কাচি বানাতে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা নেই। আর পুরাতন কাচি ধার দিতে ৫০ টাকা নেই। আমাগো মতো অল্প আয়ের মানুষদের মাসের খরচ মেটানোই ম্যালা কষ্ট। তার ওপর দিন দিন সব জিনিসের দাম বাড়তেই আছে। বাবা-মা নিয়ে তিনজনের সংসার। এখনো বিয়ে-শাদি করি নাই। বিয়ে করলে সংসারের খরচ তো আরও বেড়ে যাবে। আমাগো শখ থাকলেও সাধ্য নেই।’

মানিকগঞ্জের গ্রামাঞ্চলের স্থানীয় বাজারে গত এক বছরে চাল, ডাল, শাক-সবজি, আসবাবপত্রসহ সব ধরনের নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ। আর মৌসুমভেদে সবজির দাম বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। এতে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে একটি পরিবারের মাসিক ব্যয়। তবে সেই অনুযায়ী বাড়েনি আয়। ফলে গ্রামের নিম্ন আয়ের মানুষদের সংসার খরচ মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। শহরের চেয়ে গ্রামের জীবনযাত্রায় চাপ বেশি।

সংসারের চাহিদা পূরণে প্রচণ্ড গরমের মধ্যেও কাঁচি তৈরি করছেন কামার সঞ্চয় রাজবংশী (২৪)। ছবি: আগামীর সময়অন্যদিকে রবি ও খরিপ-১ মৌসুমে কৃষিপণ্য উৎপাদনের খরচ বাড়ছে। সার, বীজ, কীটনাশক, জমি তৈরি, সেচ, শ্রমিকের মজুরি আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। ফলে উৎপাদিত কৃষিপণ্যের বাজারদর না বাড়ায় ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন কৃষকেরা। এতে হতাশায় ভুগছেন, আর দিনে দিনে কৃষিকাজে আগ্রহ হারাচ্ছেন কৃষকেরা।

হরিরামপুর উপজেলার ঝিটকা পোদ্দার বাড়ি গ্রামের কৃষক সুমন হোসেনের ভাষ্য, ‘গতবারও হালি ও মুড়িকাটা পেঁয়াজের বাজারদর ভালো ছিল, তাতে লাভও হয়েছিল। কিন্তু এবার পেঁয়াজের দাম নেই। অথচ এক বিঘা জমিতে পেঁয়াজ চাষে খরচ হয়েছে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় পেঁয়াজের বাম্পার ফলনেও লোকসানের শঙ্কায় দিন কাটছে। পাইকারি বাজারে এবার এক মণ মুড়িকাটা পেঁয়াজ ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি করেছি। এখন হালি পেঁয়াজ ১২০০ থেকে ১৪০০ টাকা মণ বিক্রি করছি। এইভাবে বাজারদর কম থাকলে আগামীতে অনেকেই পেশা বদলাবে। কৃষকদের পণ্য বিক্রিতে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কাছে জোর দাবি জানাই। কারণ কৃষক ভালো থাকলে এই দেশ ও অর্থনীতি ভালো থাকবে।’

ঘিওর উপজেলার বারিয়াখোড়া ইউনিয়নের বাসিন্দা কৃষক গণেশ চন্দ্র সরকার জানান, ‘কৃষিকাজের পাশাপাশি শ্রমিকের কাজও করি। তাতে দৈনিক ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা আয় করি। এবছর কৃষিতে তেমন লাভও হবে না, উৎপাদন খরচ বেশি। বাড়ির জন্য ধান ভাঙিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। দুই ছেলের মধ্যে বড় ছেলেটা সরকারি দেবেন্দ্র কলেজে অনার্সে পড়ে। যা আয় করি তা দিয়ে কোনো মতে মাস চালাই, খুব কষ্ট হলেও কাউকে বলতে পারি না।’

‘দৈনিক একটি ঘোড়ার খাবার খরচ আছে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। সাথে নিজের খরচ। এরপর ছেলে-মেয়ের লেখাপড়ার খরচ। পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে চিকিৎসার খরচ। মাস শেষে হিসাব করলে আয়ের চেয়ে ব্যয়ই বেশি হয়।’ যোগ করেন তিনি।

ঘোড়ার গাড়িতে করে দীর্ঘ ২০ বছর ধরে পণ্য পরিবহন করে জীবিকা নির্বাহ করছেন দৌলতপুরের বিনোদপুর গ্রামের বাসিন্দা জিয়াউর রহমান। ছবি: আগামীর সময়কৃষকদের তথ্য, ‘জেলার পাইকারি বাজারে তারাই এসব সবজি পাল্লায় বা মণ হিসেবে কম দামে বিক্রি করে থাকেন। অথচ এলাকার খুচরা বাজারে গিয়ে সেই সবজিই বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। তাদের প্রশ্ন, কৃষকদের বোকা বানিয়ে বেশি লাভ করছে কারা?’

মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার পাঁছ বারইল গ্রামের রিকশাচালক তৌহিদ মিয়া বললেন, ‘গ্রামে সারাদিন রিকশা চালিয়ে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা আয় হয়। কিন্তু অনেকেই শহরে রিকশা চালিয়ে সারাদিন ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা, আবার কেউ হাজার টাকাও আয় করে। গ্রামের রিকশা চালিয়ে দিন শেষে যা আয় করি বাজারে গেলেই প্রায় সব শেষ হয়ে যায়।’

এদিকে গ্রাম ও শহরের সব জায়গাতেই দিনমজুরের মজুরিতে বড় অসামঞ্জস্য রয়েছে। যেখানে গ্রামের একজন দিনমজুর দৈনিক ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা আয় করেন, সেখানে শহরের একজন শ্রমিক দৈনিক ৮০০ থেকে ১০০০ টাকা কিংবা তারও বেশি আয় করেন। যদিও গ্রামের চেয়ে শহরের জীবনযাপনের ব্যয় অনেক বেশি, তবুও এই আয় দিয়ে জীবনযাত্রার খরচ বহন করাও কঠিন হয়ে যাচ্ছে বলে জানাচ্ছেন দিনমজুররা।

উত্তপ্ত কয়লার আগুনে পুড়িয়ে হাতুড়ি পিটিয়ে তৈরি করা কাঁচিতে সান দিচ্ছেন কামার সঞ্চয়। ছবি: আগামীর সময়ঘিওর উপজেলার কুস্তা গ্রামের কৃষক শাহ আলম (৫২) বলছিলেন, ‘এবছর ২৫০ বিঘা জমির একটি বোরো প্রজেক্ট রয়েছে আমার। তবে জ্বালানি সংকটে পর্যাপ্ত পরিমাণ ডিজেল পাচ্ছি না। দৈনিক বোরো প্রজেক্টের পানি দিতে ৩০ থেকে ৪০ লিটার ডিজেল লাগে। স্থানীয় বাজারে ১১৫ টাকার ডিজেল ১৪০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। এতে ধানের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। অন্যদিকে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) সেচ প্রকল্প থাকলেও দিনে গড়ে ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা মাত্র বিদ্যুৎ থাকে। লোডশেডিংয়ের কারণে ঠিকমতো ধানক্ষেতে পানিও দিতে পারছি না। এখন ধানের থোর বের হবে, এই সময় পর্যাপ্ত পানি দিতে না পারলে ধানে চিটা হবে। এখন পর্যন্ত ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা খরচও হয়ে গেছে।’

তার মতে, ‘এইভাবে চলতে থাকলে কৃষকের আগামীর স্বপ্ন নষ্ট হয়ে যাবে। প্রতিবিঘা জমিতে ২০ থেকে ২৫ মণ ধান হয়। এক মণ ধান উৎপাদন করতে ১১০০ টাকা খরচ হবে। কিন্তু বিক্রির সময় বাজারদর ভালো না পেলে কৃষকের মরা ছাড়া গতি থাকবে না। কাজেই আগে কৃষকদের উৎপাদিত কৃষিপণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে হবে।’

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) মানিকগঞ্জ শাখার সাধারণ সম্পাদক ও মানিকগঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম বিশ্বাস জানান, গ্রামের মানুষের আয়ের সুযোগ শহরের চেয়ে অনেকটাই সীমিত। তবে শহরে আয়ের সুযোগ বেশি থাকলেও ব্যয় অনেক বেশি। কিন্তু গ্রামের জীবনযাত্রার ব্যয় কিছুটা হলেও কম। তার ভাষ্য, গ্রামের কৃষিনির্ভর অর্থনীতি ও বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তেমন নেই। যার কারণে শহরের তুলনায় গ্রামের জীবনযাত্রার মানের অবনতি হচ্ছে। গ্রাম ও শহুরে জীবনযাপনের মধ্যে বিদ্যমান ব্যবধান উপলব্ধি করতে হলে প্রান্তিক পর্যায়ে যেতে হবে। শুধু উচ্চপর্যায়ে বসে নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত নিলে চলবে না। সাধারণ জনগণের কাছে গিয়ে শুনতে হবে, জানতে হবে, বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করে ধারণা নিতে হবে। একজন মানুষের শ্রমের ন্যায্য মূল্যায়ন থেকে শুরু করে সকল ধরনের সুযোগ-সুবিধা বণ্টনসহ সবক্ষেত্রেই বৈষম্য দূর করে স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে।

মানিকগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি ও জেলা কৃষকদলের সাধারণ সম্পাদক মো. আবদুস সালাম বাদল আগামীর সময়কে জানান, বর্তমান বিশ্বের সকল দেশেরই অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমেই অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে। সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ-সংঘাতের প্রভাব আমাদের দেশের ওপরও পড়েছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়ায় বাংলাদেশের বাজারেও জ্বালানির দাম বেড়েছে। তার মতে, বাজারের দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, খুব কম সময়ের ব্যবধানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম পরিবর্তন হচ্ছে। যার প্রভাব নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের ওপর পড়েছে। দিনমজুর-শ্রমিক থেকে শুরু করে সমাজের বিত্তশালীরাও এই চাপ অনুভব করছেন।

‘দেশ থেকে স্বৈরাচারের বিদায়ের পর জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে নানা ধরনের পরিকল্পনা গ্রহণ করছেন। কৃষিখাতকে গুরুত্ব দিয়ে ইতোমধ্যে কৃষকদের কৃষিকার্ড, সমাজের নিম্ন আয়ের পরিবারের জন্য ফ্যামিলি কার্ডও বিতরণ শুরু করেছে। যদি কৃষিতে পর্যাপ্ত উৎপাদন বাড়ানো যায়, তাহলে আমদানি নির্ভরতা কমে আসবে। কৃষিতে উৎপাদন বাড়াতে এবং কৃষকদের সেচের খরচ কমিয়ে উন্নত কৃষিনির্ভর অর্থনীতির জন্য সারাদেশে খাল খনন কর্মসূচিও চলমান রয়েছে। আগামীতে কৃষি উৎপাদন বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই বাজারে পণ্যের সরবরাহ বৃদ্ধি পাবে, অন্যদিকে দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল হবে। আর আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে আনতে পারলে দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।’

মানিকগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক শাহজাহান সিরাজ জানান, রাজধানীর রান্নাঘর হিসেবে খ্যাতি রয়েছে মানিকগঞ্জের। দেশের কৃষিপ্রধান জেলাগুলোর মধ্যে অন্যতম এই জেলার সাতটি উপজেলাতেই কমবেশি সবজি, ধান, পাট, ভুট্টা, পেঁয়াজ, আলু, বাদাম, সরিষা, মরিচসহ বিভিন্ন ধরনের ফসল উৎপাদন করেন কৃষকেরা। তবে রাজধানী ঢাকাসহ আশপাশের জেলাগুলোতে এখানকার উৎপাদিত সবজির চাহিদা অনেক বেশি।

তিনি ব্যাখ্যা করেন, জেলায় মোট আবাদি জমির পরিমাণ ৯৯ হাজার ৫৭৬ হেক্টর। তবে নানা কারণে গেল কয়েক বছরে আবাদি জমি কমেছে ৭০ থেকে ৮০ হেক্টর। আগের তুলনায় বর্তমানে শ্রমিক সংকট, শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি, কৃষিজমির টপসয়েল ইটভাটায় বিক্রি, মাছ চাষে কৃষিজমির ব্যবহার, কৃষিজমিতে শিল্পকারখানা ও বসতবাড়ি নির্মাণ এবং কষ্টদায়ক কৃষিকাজে নতুন প্রজন্মের অনীহাসহ বিভিন্ন কারণ রয়েছে। দিন দিন আবাদি জমি কমে যাচ্ছে, অন্যদিকে জনসংখ্যা বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে দেশে খাদ্য উৎপাদন ও সামঞ্জস্য বজায় রাখা একটি চ্যালেঞ্জ হলেও কৃষি মন্ত্রণালয় ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর আন্তরিকতার সঙ্গে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।