টিটন হত্যার পরিকল্পনা দুবাইয়ে

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১ মে, ২০২৬, ৮:০৯ পূর্বাহ্ণ
টিটন হত্যার পরিকল্পনা দুবাইয়ে

নতুন সরকার ক্ষমতায়, দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি শান্ত থাকার সুযোগ নিয়ে বিদেশে বসে মাসখানেকের পরিকল্পনায় শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটনকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজপথে প্রকাশ্যে ফিল্মি স্টাইলে হত্যা করা হয়েছে। আর এই হত্যায় প্রধান সন্দেহভাজন আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী তোফায়েল আহমেদ ওরফে জোসেফ, সঙ্গে দীর্ঘদিন বিদেশে পালিয়ে থাকা হারিছের যোগসূত্র রয়েছে।

এদিকে, গত বুধবার রাত ৮টার দিকে রাজধানীতে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটনের মরদেহ তার যশোরের বাড়িতে পৌঁছায়। যখন টিটনের মরদেহ খড়কির আপন মোড়ে পৌঁছায়, তখন প্রতিবেশী ও দীর্ঘদিনের খেলোয়াড়রা তার বাড়িতে ছুটে আসেন। শহরের কারবালার বাড়িতে মরদেহ পৌঁছলে স্বজনরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। রাতেই জানাজা শেষে শহরের কারবালা কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।

মামলার তদন্ত-সংশ্লিষ্ট ও গোয়েন্দা সূত্র মতে, ভাই খুনের বদলা এবং ঢাকার প্রধান অপরাধপ্রবণ এলাকা মোহাম্মদপুর এলাকা দখলে রাখতে জোসেফ দীর্ঘ ও সূক্ষ্ম পরিকল্পনা করে টিটনকে হত্যা করা হয়। তবে পুলিশ ও গোয়েন্দারা এখন পর্যন্ত কাউকে শনাক্ত করতে পারেনি। তাদের দাবি- তদন্ত চলমান, দ্রুত সময়ের মধ্যে হত্যার রহস্য উন্মোচন ও আসামিদের গ্রেপ্তার করা হবে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রগুলো বলছে, দুই ভাই হারিছ ও জোসেফের ছত্রছায়ায় টিটন ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন। মোহাম্মদপুরের সন্ত্রাসী চক্র হারিছ-জোসেফ গ্রুপে যুক্ত ছিলেন। টিটনের তৎপরতা ছিল ধানমন্ডি ও হাজারীবাগ এলাকায়। ১৯৯৯ সালের ১৩ মার্চ ইমন বাহিনীর হাতে খুন হন জোসেফের ভাই আবু সাঈদ টিপু ও তার বন্ধু এমরান। ইমন ও টিটন এ হত্যা মামলার আসামি। ভাই হত্যার বদলা নিতে টিটনকে হত্যা করা হয়েছে।

বিদেশে আত্মগোপনে থাকা এক শীর্ষ সন্ত্রাসী রূপালী বাংলাদেশকে জানিয়েছেন, জোসেফের জেদের কারণে বড় ভাই হারিছ অনুমতি দিলে সেখানেই টিটন হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। আর এতে নেতৃত্ব দেয় দেশে থাকার হারিছ-জোসেফ গ্যাংয়ের ‘কিলার বাদল’ ও ‘ডাগারি রনি’। হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয় এক ডজন প্রশিক্ষিত সন্ত্রাসী। টিটন যাতে কোনোভাবেই বাঁচতে না পারে সেজন্য প্লান এ ও প্লান বি ছিল। হত্যায় দুজন অংশ নিলেও আশপাশে গ্রুপের অন্যরা নজরদারিতে ছিল। হারিছ-জোসেফ বিদেশে বসেই টিটন হত্যার পরিকল্পনা হয়েছে জোর দাবি করেন এই শীর্ষ সন্ত্রাসী। মূলত দুবাই থেকে টিটন হত্যার পরিকল্পনা করা হয় বলে সূত্রের দাবি।

গোয়েন্দা সূত্র জানায়, ঢাকার অপরাধজগতের অভ্যন্তরীণ বিরোধের জেরে টিটনকে হত্যা করা হয়েছে বলেই ধারণা। মোহাম্মদপুর ও আশপাশ এলাকার অপরাধজগতের নিয়ন্ত্রণ এবং স্বার্থকেন্দ্রিক বিরোধ থেকেই টিটনকে হত্যা করা হতে পারে। টিটন ও জোসেফ নব্বইয়ের দশকে একই অপরাধী দলে যুক্ত ছিলেন। এই অপরাধী দলের নিয়ন্ত্রক ছিলেন সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদের ছোট ভাই জোসেফ। খুনের শিকার টিটনও এই বাহিনীর সদস্য ছিলেন। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে আধিপত্য বিস্তার ও অভ্যন্তরীণ বিরোধের জেরে ইমন ও পিচ্চি হেলাল আলাদা সন্ত্রাসী দল গঠন করেন। ১৯৯৭ সালে একটি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হন জোসেফ। তার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছিল। ২০১৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাষ্ট্রপতির ক্ষমা পেয়ে মুক্তি পান। তিনি কারাগারে থাকা অবস্থাতেই ১৯৯৯ সালের ১৩ মার্চ ইমন বাহিনীর হাতে খুন হন জোসেফের ভাই আবু সাঈদ টিপু ও তার বন্ধু এমরান। ইমন ও টিটন এ হত্যা মামলার আসামি।

বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে ২০০১ সালে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের একটি তালিকা প্রকাশ করে পুলিশ। ওই তালিকায় মোহাম্মদপুরের ইমন, টিটন, পিচ্চি হেলাল ও হারিস আহমেদের (সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদ ও জোসেফের ভাই) নাম ছিল। হারিস আহমেদ ছাড়া অন্যরা গ্রেপ্তার হয়ে দীর্ঘদিন কারাগারে ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের ১০ দিনের মধ্যেই ইমন, হেলাল ও টিটন কারাগার থেকে মুক্ত হন। তারপর এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তাদের মধ্যে বিরোধ প্রকাশ্যে আসে। তাদের মধ্যে ইমন বিদেশে পালিয়ে গেলেও পিচ্চি হেলাল ও টিটন দেশেই অবস্থান করেন। তবে তাদের বিরোধ চরম আকার ধারণ করে।

আমাদের যশোর প্রতিনিধি স্থানীয়দের বরাত দিয়ে জানান, এই প্রজন্মের অনেকেই টিটনকে চেনেন না। দীর্ঘদিন যশোরে না থাকাতে এই প্রজন্মের কেউ তার নামও শোনেননি। তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিন থেকে চারবার যশোরের বাড়িতে আসেন। তিনি অবিবাহিত। বাড়িতে এসেও কারো সঙ্গে যোগাযোগ করতেন না। তবে স্বজনরা টিটনের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি।

টিটন আমার বন্ধু, ওকে আমি ভালোবাসতাম, দাবি হত্যার মূল অভিযুক্ত পিচ্চি হেলালের : খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন হত্যাকাণ্ডে নিজের কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলে দাবি করেছেন ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলাল। গত বুধবার রাতে বিভিন্ন গণমাধ্যমে পাঠানো অডিও রেকর্ডে তিনি জানান, টিটনের সঙ্গে তার ‘চমৎকার সম্পর্ক’ ছিল এবং তাকে তিনি ‘বন্ধু হিসেবে ভালোবাসতেন’।

হেলাল অভিযোগ করেন, স্থানীয় কিছু অনলাইনভিত্তিক গণমাধ্যম অপরাধচক্রের প্রভাবেই বিভ্রান্তিকর সংবাদ প্রচার করছে এবং প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করতে তার নাম সামনে আনা হচ্ছে। তার দাবি, তার কোনো ‘কিশোর গ্যাং’ বা সন্ত্রাসী বাহিনী নেই; বরং রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার কারণে সহজেই তাকে লক্ষ্যবস্তু বানানো হচ্ছে। টিটন হত্যার বিষয়ে হেলাল বলেন, নিহত টিটন অতীতে তার সঙ্গে টেলিভিশনে বক্তব্য দিয়েছেন এবং স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করছিলেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, টিটন জীবিত অবস্থায় তাকে জানিয়েছিলেন যে প্রতিপক্ষ সানজিদুল ইসলাম ইমন ওরফে ক্যাপ্টেন ইমন একাধিক মামলা দিয়ে তাকে হয়রানি করছে এবং হত্যার আশঙ্কার কথাও প্রকাশ করেছিলেন। হেলাল আরও দাবি করেন, এই হত্যাকা-ের সঙ্গে ইমনের স্ত্রীর সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।

হত্যাকা-টি পূর্বপরিকল্পিত বলেও মনে করেন হেলাল। তার ভাষ্য অনুযায়ী, টিটনের ওই এলাকায় যাওয়ার কথা ছিল না; তাকে ‘টোপ দিয়ে’ সেখানে নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘মোবাইল ফোনের কললিস্ট ও ডেটা ফরেনসিক বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যাবে কে বা কারা তাকে সেখানে ডেকেছিল এবং কারা ঘটনার সময় উপস্থিত ছিল।’ প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত হলে প্রকৃত চিত্র সামনে আসবে এবং তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগও মিথ্যা প্রমাণ হবে বলে জোর দিয়ে বলেন তিনি।

গত মঙ্গলবার রাত পৌনে ৮টার দিকে রাজধানীর নিউমার্কেটের পশ্চিম পাশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহনেওয়াজ ছাত্রাবাসের সামনে টিটনকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। ২০০১ সালে সরকারঘোষিত ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকার ২ নম্বরে ছিল তার নাম। দীর্ঘদিন কারাগারে থাকার পর ২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট জামিনে মুক্তি পান তিনি।

সংবাদটি rupalibangladesh.comওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে। তথ্যের সঠিকতা ও মালিকানা বিষয়ে কোনো প্রশ্ন থাকলে অনুগ্রহ করে মূল সূত্রের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।