কালিহাতীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্ল্যান্ট: কঠিন বর্জ্য কঠিনই আছে
আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে কঠিন ও মানববর্জ্য পরিশোধন করে জৈবসার ও বায়োগ্যাস উৎপাদনের লক্ষ্যে টাঙ্গাইলের কালিহাতী পৌরসভায় নেওয়া হয়েছিল ‘সমন্বিত কঠিন ও মানববর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্ল্যান্ট’ প্রকল্প। ২০২২ সালের ১ মার্চ ঢাকার ‘টার্ন-এনসি (জেভি)’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। আট মাসের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা থাকলেও সাড়ে চার বছরেও প্রকল্পের অবকাঠামোর কাজ শেষ হয়নি। ফলে এখনো উৎপাদন শুরু হয়নি জৈবসার কিংবা বায়োগ্যাস।
পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ১৫ দশমিক ৫২ বর্গকিলোমিটার আয়তনের কালিহাতী পৌরসভায় ৯টি ওয়ার্ড ও ১৮টি মহল্লা রয়েছে। জনসংখ্যা প্রায় ৪২ হাজার। প্রতিদিন পৌর এলাকায় গড়ে দেড় টন কঠিন ও তরল বর্জ্য তৈরি হয়। কিন্তু নির্দিষ্ট কোনো ডাম্পিং স্টেশন বা ময়লা ফেলার স্থান না থাকায় বিভিন্ন স্থানে যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলছেন পৌরবাসী। এতে পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি নানা ধরনের জটিলতা তৈরি হচ্ছে।
এ পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ পেতে পৌর কর্তৃপক্ষ ৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘সমন্বিত কঠিন ও মানববর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্ল্যান্ট’ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। প্রকল্পে রয়েছে প্ল্যান্টেড ড্রায়িং বেড ও অ্যানেরোবিক ব্যাফেল রিঅ্যাক্টর (এবিআর)। এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে মানববর্জ্যের তরল অংশ ক্ষতিকারক উপাদানমুক্ত করার কথা। রয়েছে কনস্ট্রাক্টেড ওয়েটল্যান্ড ও পলিশিং পন্ড, যার মাধ্যমে পানি পরিশোধন করে প্রকৃতিতে অবমুক্ত করার ব্যবস্থা থাকবে।
এ ছাড়া কম্পোস্ট শেড ও সর্টিং শেডে বর্জ্য সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাত করা হবে। লিচেট ট্যাংক ও কমবাসশন ইউনিটের মাধ্যমে ময়লা থেকে নির্গত দূষিত তরল ও গ্যাস নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য পার্কিং শেড, অফিস রুম ও সিকিউরিটি রুমসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় ইউনিটও প্রকল্পে রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা জানান, প্ল্যান্টটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে শহরের সব ধরনের বর্জ্য এখানে এনে প্রথমে লোহালক্কড়, প্লাস্টিক, পলিথিন, বোতল, কাঠ ও কাচের মতো অপচনশীল দ্রব্য আলাদা করা হবে। এরপর পচনশীল বর্জ্য ও শুকনো মানববর্জ্য বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে প্রক্রিয়াজাত করে উন্নতমানের কম্পোস্ট জৈবসার উৎপাদন করা হবে। পাশাপাশি উৎপাদিত হবে প্রাকৃতিক গ্যাস।
তবে প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ না হওয়ায় এসব সুবিধা এখনো বাস্তবে রূপ নেয়নি।
সরেজমিনে দেখা গেছে, প্ল্যান্টের চারপাশে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করা হয়েছে। তবে মূল শোধনপ্রক্রিয়ার অন্যতম অঙ্গ কমবাসশন মেশিনের জন্য নির্ধারিত শেড এখনো নির্মাণ করা হয়নি।
প্রকল্পের ঠিকাদার নূরে আলম টিটু বলেন, জমি অধিগ্রহণ নিয়ে কিছু আইনি জটিলতা, স্থানীয় এলাকায় রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, নিচু এলাকা হওয়ায় মাটি ভরাটে সমস্যা এবং দীর্ঘ সময় জলাবদ্ধতা থাকার কারণে নির্মাণকাজ অনেকটা পিছিয়ে গেছে।
এদিকে, বর্জ্য পুড়িয়ে ধ্বংস করার মূল চালিকাশক্তি ‘কমবাসশন মেশিন’ সরবরাহের কাজও থমকে আছে। প্রায় ৪ কোটি টাকা ব্যয়ে আধুনিক এ মেশিন সরবরাহের জন্য ২০২৪ সালে ‘লাবণী-কেএইচটি (জেভি)’ নামের আরেকটি যৌথ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। এক বছরের মধ্যে মেশিন সরবরাহের চুক্তি থাকলেও এখনো তা সরবরাহ করা হয়নি।
মেশিন সরবরাহে বিলম্বের কারণ সম্পর্কে ঠিকাদার সাদেকুল ইসলাম কাঞ্চন বলেন, গত বছরগুলোতে চীনের সঙ্গে ব্যাংক এলসি (ঋণপত্র) খোলার ক্ষেত্রে জটিলতা ছিল। এ এলসি সমস্যার কারণে যথাসময়ে মেশিনটি আনা সম্ভব হয়নি।
কালিহাতী পৌরসভার প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা আক্তার বলেন, কাজ শেষ করার জন্য ঠিকাদার ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরকে তাগিদ দেওয়া হয়েছে। নানাবিধ কারণে প্রকল্পটি এখনো চালু করা সম্ভব হয়নি।







আপনার মতামত লিখুন
Array